শ্রদ্ধাঞ্জলি- বাসুদা

সময়ের সাথে দেখা হলে একটি কথাই জিজ্ঞেস করতাম। ‘এত অগোচরে, এত দ্রুত কীভাবে চলে যাও!’

বাসুদার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বিপরীত প্রান্তে বাসুদার বাসায় আড্ডা-গান নিয়ে সময় কাটিয়েছি এন্তার। সহজ মানুষ ছিলেন। বয়সে আমার সিনিয়র ছিলেন তো বটেই কিন্তু আমার সাথে বন্ধুর মত মিশতেন। আমিও সহজ হয়ে গিয়েছিলাম বাসুদার সাথে। ভালো লাগা- না লাগা অকপটে বলে ফেলতাম। এই নিয়ে একটা দিনও মনক্ষুণ্ণ হতে দেখিনি।

তখন বাপ্পা-বাসু জুটি বেঁধে কাজ করে। বাসুদার বাসায় গেলেই দেখা যেত এক ঝাঁক ছেলে-মেয়ে বসে গান শিখছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই সমস্বরে গান শোনা যেত তাই। সেই সময়ে স্টুডিও পাড়ায় গেলে ক্যাসেট বের করতে চান এ রকম অনেক নতুন মুখের সাথে দেখা হতো। সারি বেঁধে বসে থাকতেন। অডিও আর্ট স্টুডিওতে এ রকম এক রাতে গিয়েছি। হঠাৎ পরিচিত একজন আমাকে চিনে ফেলে ‘আরে রানা, তুমি এখানে কী করো?’- প্রশ্নে বাসুদার গম্ভীর মুখের উত্তর- ‘ও রানা, আমাদের বন্ধু …আমার কানে এখনও ধাক্কা দেয়। কানে নয়, আসলে হৃদয়ে।

বাসুদার চমৎকার কিছু সুর আছে। ‘তোমার ঐ মনটাকে একটা ধূলো মাখা পথ করে দাও, আমি পথিক হব’ অথবা ‘হৃদয়হীনা তুমি কী আমার কথা ভাবো’। ‘পাখি উড়ে যায় কবিতার ডানা মেলে’ গানটার কথাও মনে পড়ে। তিনটা গানই ‘একটি নারী অবুঝ’ মিক্সড অ্যালবামের। নানা ধুনের, ফোক- মেলো রক-ফিউশনের একটা ভালো অ্যালবাম ছিল। বাসুদার স্টুডিওতেই পাখি লিরিকের সুত্রে মিজানের সাথে পরিচয় হয়েছিল। গীতিকারকে মনে রাখার কথা বলেছিলেন, ঠিক কী বলেছিলেন আমার আর মনে নেই। শুধু মনে আছে মিজানের সম্মতি এবং সহাস্যে দুজনের করমর্দন। বিলক্ষণ মনে পড়ে, গীতিকার সকালকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের মিরপুরের বাসায়। সেই অ্যালবামে সকল গীতিকারের ছবি গিয়েছিল। এর আগে গানের কোনো অ্যালবামে আমি অন্তত গীতিকারের ছবি দেখিনি।

পরে আর একটা কাজ করেছিলাম। বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি মিক্সড অ্যালবামের। ‘দুঃখ শেষ হয়, শেষ হয় কষ্টের রাত্রি’। বালাম গেয়েছিলেন। এর পর আর বাসুদার সাথে আমার কাজ করার সুযোগ হয়নি। যোগাযোগও ক্ষীণতর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাসুদার সাথে আমার বন্ধুতা একইরকম ছিল। ঢাকায় গিয়ে বাসুদার সাথে যোগাযোগ হয়েছে, এডিনবরা থাকতে একরাতে দূরালাপনীতে দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতা হয়েছে। দেশের গানের বিশাল কর্মযজ্ঞের কথা শুনে আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, করছে কী বাসুদা! এই কাজ শেষ হবে তো? শেষ পর্যন্ত বাসুদার আকস্মিক প্রয়ানে এক হাজার গানের কাজ আর শেষ হলো না।

রাজারবাগের সেই বাসায় দেখা হত অনেকের সাথেই। মোনায়েম, সেই শুরুর দিকের সন্দীপনদা, স্বপ্নীলদা, সকাল আর বাপ্পা ভাই। মাঝে মাঝে একসাথেই আমি আর বাপ্পা ভাই বাসুদার বাসায় যেতাম। গান নিয়ে আড্ডা আর বাসুদার উচ্চ মার্গের রসিকতায় হাসির হুল্লোর উঠতো সেই ঘরে। সমস্বরে।

শোণিত প্রাণের ধারায় ভালো থাকুন বাসুদা। মানুষের নিখাদ ভালোবাসাই আমি মনে রাখব। আপনাকে তাই মনে রেখেছি, আজীবন আপনি আমার অন্তরে থাকবেন।কবিতার ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখি অথবা দুঃস্বপ্ন শেষে আলোর পথযাত্রী হয়ে।

শ্রদ্ধাঞ্জলী, বাসুদা’

টুকরো নাগরিক জার্নাল

ক্যানটন, কার্ডিফউনত্রিশ/ ডিসেম্বর। ২০২০

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s