Journal

Featured

বন্ধুরে তোর কাছে আমার ভালোবাসা, ঋণ…

(১)

আমি জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াই।

বিলেতে আক্ষরিক অর্থে আমার তখন নির্বাসন দন্ড। ২০০৭ এর শেষের দিক। ইস্ট লন্ডনের সারি বাঁধা টেরাসড হাউজের একটা ছোট্ট ঘর। কাজ করে অল্প অল্প টাকা জমিয়ে একটা ল্যাপটপ কিনেছি সম্প্রতি কিন্তু টেকনোলজি চ্যালেঞ্জিং মানুষ হওয়ায় রাতে সেই দুই কামরার ঘরে ফিরে নাটক আর আবিষ্কার করা ইউটিউব দেখা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই। প্রথমবারের মত আমার রাইটার্স ব্লক চলছে বছর ধরে। এমন এক ক্রান্তিকালে আমি এক এক করে স্কুলের বন্ধুদের খুঁজে পেলাম। বলা ভালো আমাকে খুঁজে বের করলো কেউ কেউ। তার মধ্যে সবচাইতে প্রণিধানযোগ্য যে নাম, সে খুব ছটফটে, চঞ্চল কিন্তু শাণিত বুদ্ধিমত্তায় কথা বলা এক বন্ধু। 

তার নাম রাশীদ। আমাদের রাশীদ মাহমুদ। এক অফুরান প্রাণশক্তির সহপাঠী আর আমার বড়বেলার অন্যতম প্রিয় বন্ধু।

(২)

ছোটবেলায় আমি ছিলাম স্বাস্থ্য বিচারে আরো ছোট। শীর্ণকায়, গুটিশুটি মেরে থাকা এক শিশু। সেই শিশু ভর্তি হলো ঢাকার সবচাইতে সুন্দর আর নয়নাভিরাম এক স্কুলে। যার নাম রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল। আব্বা-আম্মার খুশী খুশী চোখের সামনে আমার শৈশবের সব আনন্দ ম্লান হয়ে গেল যখন ৩৬৫৩ লেখা একটা কালো ট্রাংকসমেত আমাকে হোস্টেলে রেখে আসা হলো। সেই হোস্টেলের নাম কুদরত-ই-খুদা হাউজ। 

ক্লাস থ্রি আর ক্লাস ফোর মিলিয়ে আমি কিছুদিন হোস্টেল জীবনযাপন করেছি। রিউমেটিক ফিভার হবার কারণে সেমিবোর্ডার হয়ে যাবার আগ দিয়ে কুদরত-ই-খুদা হাউজের সহপাঠীদের নাম মনে রাখতে বেশী সময় লাগেনি। সালেহ, ইভান, ফরিদ, কামরুল, সালেহউদ্দিন, মিজান, মাহবুব পারভেজ, ইমরান, বাবু আর রাশীদ। কলেজ নাম্বার- ৩১৬১।

দূরতম স্মৃতিতে মনে পড়ে একসাথে ঘুম চোখে উঠে ভোরের পিটি, তাহের স্যারের বাঁশীর ফুঁ, সকাল বেলা টেবিলে কাঠের ডালের চামচে বাড়ি দিয়ে বিসমিল্লাহ বলে খাবার শুরু। তারপর ক্লাস ফোরে আমাদের একদল সেকশন ফোরে। রুম প্রিফেক্ট চঞ্চল ভাই আর তার সহকারী জিয়াউল। আমার বেড এর দুই এক বেড পরে কামরুল আহমেদ। বাকী সহপাঠীরা থাকতো অন্য রুমে। শামসুজ্জামান বাবু রুম প্রিফেক্ট আর সালেহ তার সহকারী। সেই রুমেই থাকতো রাশীদ। আমাদের বেশীর ভাগের একটা টিজ করা নাম বরাদ্ধ ছিল। বড় হয়েও তার হেরফের হয়নি। আমার নামের শেষের মতিন হয়ে যায় মূতী শরফুদ্দিন। রাশীদ, তোর টিজ নাম বল তো, মনে পড়ে না কেন? রইশ্যা না রশীদ?

শুধু মনে পড়ে, স্কুলে দুইজনের আব্বা ফিফটি হোন্ডা চড়ে আসত। এক হলো মতিনের আব্বা আর এক ফিফটি হোন্ডার সওয়ার ছিল রাশীদের বাবা। সুপরিচিত তাহের কাকা।

হোস্টেলবেলার রাশীদের অবয়ব আমার চোখে লেগে আছে। ছটফটে, দুষ্ট, চোখ পিটপিট করে হাসতে থাকা চঞ্চল এক শিশু। পড়াশোনায় বরাবর ভালো রেজাল্ট, স্যার-টিচারদের স্নেহধন্য আর অতি অবশ্যই ফেব্রুয়ারির বটতলায় ফি বছর অনুষ্ঠিত হওয়া সাংস্কৃতিক সপ্তাহের পরিচিত মুখ। এক নাটিকার কথা মনে পড়ে আমার। রাশীদ, সালেহ আর সালেহউদ্দিন মূল কুশীলব। মাত্রই স্বৈরাচার পতন হয়েছে। সেই নব্বই পরবর্তী এক দিনে রাশীদ এরশাদের চরিত্রে দূর্দান্ত অভিনয় করে। সাথে স্বার্থক সঙ্গত সালেহ আর সালেহউদ্দিন এর। কাজী জাফর, শাহ মোয়াজ্জেম চরিত্রের কী সব দারুণ সংলাপ! এইসব ফিরে ফিরে আসে, দেখি। আর দেখতে পাই লাল রঙা কার্পেটে বসে হাসিতে কুটিকুটি হয়ে যাওয়া একদল শিশুকে। তার মধ্যে আমিও আছি।

(৩)

নির্বাসন দন্ডের কথা বলছিলাম না? আমি তারও অনেক আগে গীতিকার হবো বলে এক স্বঘোষিত স্বাধীনতা নিয়েছি বটে কিন্তু হঠাৎ দেখা বাস্তবতার ঘূর্ণিপাকে পড়ে গিয়ে নিজেকে হারিয়েও ফেলেছি। পরিচিত সবার কাছ থেকেই। সেই সময়ে ইয়াহু মেইলের কল্যাণে আমাকে খুঁজে বের করে ইফতেখার, সালেহ আহমেদ, রাশীদ মাহমুদ, হাসান আশরাফ মিঠু আর দেওয়ান সাইফুর রহমান। হতবিহবল প্রবাস জীবনে এক টুকরো আনন্দের মেঘ  সেই টেরাসড হাউজের এক কোনে আমাকে টুকরো আনন্দ দেয়। রাশীদ তখন নৃবিজ্ঞানে ওর দ্বিতীয় মাস্টার্স করছে, অস্ট্রেলিয়াতে অস্থায়ী নিবাস। সাথে আছে ওর সুযোগ্য সহধর্মিনী লায়লা। আর পুরোনো এক ঝাঁক বন্ধুরা। শুধু বন্ধু? না, আত্মার আত্মীয়রা।

ইচ্ছেস্বাধীন জীবন বলি, কিন্তু প্রথমবারের মত টের পেতে শুরু করি এই বদলে যাওয়া জীবন ধারাপাত প্রতিষ্ঠা চায়, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য চায় আর চায় পরিচিতি। এই তিন বৃত্ত থেকে বহু আগেই আমি ছিটকে পড়ে গেছি। সেই কেতাতেই  আড়াই বছর বিলেতে থেকে হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিরে আসি ঢাকায়। মনে হলো এবার আমার বোহেমিয়ান জীবন শেষ হোক। এক-দুইদিন পরেই রাশীদের ফোন। 

– কীরে, চইলা আসছিস সত্যি সত্যি? ওহন কী করবি? শুধু গান লিখলে তো হইবো না দোস্ত। একটা চাকরী শুরু কর।

– চাকরী! ধুর। আমাকে কে চাকরী দিবে!

– মোহিম ভাইরে ফোন দে। নাম্বার লেখ।

ছোটবেলার সহপাঠী রাশীদ বড়বেলায় আমার বন্ধু হয়ে যায়। আমার দুঃখ-আনন্দে অন্যতম প্রিয় বন্ধু। যার সাথে সঙ্গীত, রাজনীতি, সমাজ, বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলা যায়। খুব নিয়মিত যোগাযোগে আমি থাকতে পারিনা, কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে যে আমাকে খোঁজ করে, আগলে রাখতে চায়। যে একটা অসাধারণ জীবন কাটায়, কিন্তু থাকতে চায় সাধারণ। যার গায়ে একটা সুখী মানুষের জামা আছে।

(৪)

ঢাকায় ফিরে রাশীদের সাথে প্রথম দেখা, বাপ্পা ভাইয়ের স্টুডিওতে। বাপ্পা ভাইয়ের স্টুডিও তখন মগবাজারে। ফোনে স্থান-কাল-পাত্র শুনেই মিনিট দশেকের মধ্যে বন্ধু হাজির। দেখি, থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট, হাতে ছোট করে আঁকা উল্কি আর পড়নে চোস্ত এক টি শার্ট। গাড়ি থেকে নেমেই দুজন দুজনকে আলিঙ্গনে বাঁধি। কত বছর পর দেখা তার হিসেবও নেই। আমি না ছিলাম বাস্তবে না ছবিতে। কিন্তু রাশীদ ছিল সদর্পে, স্বমহিমায়। ততদিনে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এন্থ্রোপলজিতে দ্বিতীয় মাস্টার্স শেষ করে রাশীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক। শুনে আমার খুব ভালো লাগে। স্টুডিওর সবাইকে আনন্দ নিয়ে পরিচয় করিয়ে দেই- ‘এ হলো রাশীদ। আমার স্কুল ফ্রেন্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার।’

আমার বন্ধু স্বতঃস্ফূর্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচারসুলভ কোনো গাম্ভীর্য নেই, অহমিকা তো ওর অভিধানেই ছিল না। 

সেই বিকেলে ওর বাসায় এক প্রস্থ চা-নাস্তা সেরে সদ্য কেনা গাড়িতে কলাবাগান-মিরপুর ঘুরে বেড়াই দুই বন্ধু।

আর একদিন। রাশীদের ফোন পেয়ে আশরাফের মতিঝিল চেম্বার উদ্বোধনে যাই। স্কুলের অনেক সহপাঠি-বন্ধুর সাথে যুগ পেরিয়ে দেখা হয়। সুহৃদ এর সাথে দেখা হয়। রাশীদের বড় ছেলে। সেই মিলাদ-মাহফিল শেষে আমি আবার ডুব দেই। নাগরিক লিরিক আর স্টুডিও করে আমার দিন কাটে। কিন্তু রাশীদ যাকে বন্ধু ভাবে তার পক্ষে দীর্ঘকাল ডুব দিয়ে থাকা কী সম্ভব হয়, না হয়েছে কোনোদিন?

(৫)

রাশীদের সুত্রে মোহিম ভাইয়ের যোগাযোগ মারফত বিজ্ঞাপনী সংস্থায় নতুন জীবন শুরু হয় আমার। সে এক বর্ণিল সময়! কপিরাইটার হয়ে অল্প অল্প কাজ শিখে বিজ্ঞাপনের ব্যস্ততায় সমর্পণে সচেষ্ট হই। কিন্তু মনে মনে সেই ছন্নছাড়া গীতিকবি থেকে যাই। এরই ফাঁকে একদিন আই সি সি বিশ্বকাপের থিম সং মার ঘুরিয়ে লেখা হয়।

মার ঘুরিয়ে নিয়ে বন্ধুদের অফুরান উচ্ছ্বাস টের পাই। একই আনন্দ পাই যখন স্কুলের জন্য গান লিখি। একটু একটু বেড়ে ওঠার দিন/ বন্ধুরে তোর কাছে আমার ভালোবাসা ঋণ...  বিশাল সমারোহে স্কুল প্রাঙ্গনে সেই রি ইউনিয়ন এর ইভেন্ট হয় একদিন। দূর থেকে সেই আনন্দ গায়ে মাখতে ভালো লাগে আমার। সেই রাতে, বোধহয় সাড়ে নয়/ দশটা বাজে, ফোন পাই। হ্যালো বলতেই ফোনের ওপাশে সমস্বরে থীম সং শুরু হয়। গান শেষ হতেই রাশীদের চিরাচরিত ভঙ্গিতে উচ্চারন।

-কবিয়াল তুই আইলি না ক্যান! এইটা একটা কাম করলি?


তারপর দেড় বছরের মাথায় আমার মনে পড়ে এই নিয়ম করে নিয়ম মানা আমার পোষাচ্ছে না। কাজটা ছেড়ে দেই। অনেক দিন আগের একটা পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে ঘুরছিলাম। ভাবলাম এই হলো মোক্ষম সময় তা বাস্তবায়নের। প্রাইমারী স্কুলে লাইব্রেরী করে  দিব বাচ্চাদের জন্য। নাম হবে লাল সবুজ বই ঘর। রাশীদ খুব উৎসাহ দেয়। ফেনীতে ওর গ্রামে ও একটা লাইব্রেরি চালায়, বাসায় বসে তার ছবি দেখায়।

আমার মনে আছে ২০১২ বইমেলায় আমার প্রথম বই বেরুলো। সন্ধায় বসে আছি বাঙলা একাডেমি প্রাঙ্গনে। রাশীদের ফোন। 

-থাক, আইতাসি আমি।

রাশীদ আসে। সাথে এন্তার বই দুই হাতে। রশি দিয়ে বাঁধা। 

– কী রে এত বই কী করবি? 

– আরে ব্যাটা, স্কুলে পাঠামু। তোরে কইসিলাম না আমি একটা লাইব্রেরী করে দিসি। দ্যাখ, তোর দুইটা বই নিসি।

তারপর আমরা আরো বই বগলদাবা করে আরো আড্ডা দিয়ে সি এন জি ডাকি। রাশীদ আমাকে বিদায় বলে বইসমেত চলে যায়।

(৬)

রাশীদের সাথে আমার যত বাক্যালাপ হয়েছে, তার সিংহভাগ চ্যারিটি সংক্রান্ত। মানুষের জন্য কিছু করার এই আকুলতায় ও সবার চেয়ে অনন্য ছিল, অনন্যসাধারণ ছিল। কোনো বন্ধু একটু খারাপ অবস্থায় আছে, রাশীদ এগিয়ে এসেছে সবার আগে। কেউ অসুস্থ হয়েছে রাশীদের কথা বলা শুরু অথবা মাসে মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমান টাকা সবাই মিলে জমা করলে বিপদে আপদে কাজে লাগবে- এই সবকিছু নিয়ে রাশীদ ব্যতিব্যস্ত থাকত, থাকতে পছন্দ করতো।

কিছুদিন আগেই ফেসবুকে ছবি দেখছিলাম। খাগড়াছড়ি না বান্দরবান? প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একাডেমিক কাজে চষে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। ক্ষনে ক্ষনে গানের ক্লিপ ভেসে আসতো। পাশেই পরিচিত মুখ দেখতাম শিল্পীদি বা অন্য কাউকে। দলবল নিয়ে গানে-আড্ডায় সারাক্ষণ সরগরম। জীবনের রূপ-রস-গন্ধ রাশীদের মত এত প্রানভরে আর কে নিতে পেরেছে? নিয়েছে?

(৭)

বছর তিন আগে বার্সিলোনায় গিয়েছিলাম। ফিরে এসে যখন স্কুল বন্ধুদের গ্রুপে ছবি পোস্ট করি, রাজন বলেছিল আমরা একসাথে ন্যু ক্যাম্পে বসে একটা খেলা দেখব। আমি সত্যি মাথায় টুকে নিয়েছিলাম সেই কথাটা। দৃশ্যটা কল্পনায় বেঁধে রেখেছিলাম- আমি, রাজন বার্সার খেলা দেখছি। আর অতি অবশ্যই সাথে রাশীদ আছে। রাশীদ ছাড়া এই আনন্দমুখর গ্যালারীর কথা আমি কল্পনাও করতে পারিনা। কিন্তু রাশীদকে সেই কথা আর বলা হয়নি আমার। আমাদের একসাথে আর যাওয়া হয়নি, হবেও না। আমি ভুলে গিয়েছি সব।

যেমন ভুলে গিয়েছি রাশীদের এই হাস্যোজ্জ্বল, খেলাপাগল, আনন্দমুখর হাসিমুখের আড়ালে ওর নৃবিজ্ঞানী পরিচয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়ে গেল কবে তাই তো জানা হয়নি। নিজের অর্জন, প্রাপ্তি নিয়ে রাশীদকে কখনও উচ্চবাচ্য করতে দেখিনি। অন্যের খুঁটিনাটি নিয়ে সরব কিন্তু নিজের অর্জনকে আড়াল করে রাখাই তো প্রজ্ঞা। আমাদের রাশীদ শুধু বিদ্বান নয়, প্রজ্ঞাবান মানুষ ছিল।

আত্মসমালোচনাতে মোক্ষ লাভ আর ভোগবাদকে যথাসম্ভব ব্যক্তি জীবন থেকে দূরে রাখার মূলমন্ত্র ছিল নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক রাশীদের দর্শন। সেই দর্শন রাশীদ চলার পথের পাথেয় করেছে, আমরা কী পেরেছি?

না বোধহয়।

(৮)

আমার জন্ম ১৫ আগস্ট, ঠিক একদিন পরে ১৬ তারিখ আমার বন্ধু রাশীদের জন্মদিন। ফেনীতে জন্ম নিয়ে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলে এস এস সি আর নটরডেম কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে কৃতিত্বের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় নৃ বিজ্ঞান বিভাগে। এস সি সিতে মানবিক বিভাগ থেকে নয় নম্বরের জন্য বোর্ড স্ট্যান্ড করা হয়নি রাশীদের। একইভাবে এইচ এস সি তে কমার্স বিভাগে নাম লিখিয়েও দূর্দান্ত ফলাফল। নটরডেম এর ডিবেটিং সোসাইটির কর্ণধার হয়ে নানাবিধ ব্যস্ততা। রাশীদের হরিহর আত্মা সালেহ আহমেদ এর সোনালী স্মৃতির দেরাজ বইয়ের মত করে বললে রাশীদ ছিল অগোছালোভাবে গোছানো। স্নাতক আর স্নাতকোত্তরেও ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা রেখে  সবার মধ্যে প্রথম হবার কৃতিত্ব অর্জন করে রাশীদ। ওর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু হয় ইডেন মহিলা কলেজে। কিছুদিন পরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেয়। বছর দুই শিক্ষকতা করে ফিরে আসে ওর নিজস্ব পরিমন্ডল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক হয়ে অধ্যাপক হয় আমাদের রাশীদ। সমান্তরালে চলতে থাকে এথনিসিটি, ব্যাক্তি পরিচয় ও প্রান্তিকতা, নৃবিজ্ঞান  তত্ত্বের ক্রিটিকাল টার্ন নিয়ে ওর গবেষণা। একাডেমিক জগতে রাশীদ একের পর এক সফলতার পালক জুড়েছিল নিজের ডায়েরীতে। বারোটি জার্নালে ওর গবেষনাপত্র প্রকাশ পেয়েছিল। বেশ কিছু অনুবাদ করেছিল। রাশীদ উজ্জ্বল ছিল ওর শিক্ষকতায়। বোধিচিত্ত নামে একটা প্ল্যাটফর্মে চমৎকার আলোচনা করেছিল। নৃবিজ্ঞানে আগ্রহীদের জন্য সে সব গুরুত্বপূর্ণ হবার কথা।

রাশীদ পি এইচ ডি শুরু করেছিল এই কিছুদিন আগে। ওর গবেষনার বিষয়বস্তু ছিল community based water management। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে এই গবেষনার কাজেই রাশীদ কর্মমুখর ছিল জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

তারপর প্রেজেন্টেশন দিতে দিতেই রাশীদ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো। মার্চ এর ৩১ তারিখে। আমি তখন সুদূর কার্ডিফে। মোহিম ভাইয়ের টেক্সট পড়ে বিহবল হয়ে কাঁদছি।

(৯)

রাশীদকে আমি বুঝতে পেরেছিলাম। এই বিপুলা পৃথিবীতে রাশীদ একটা অলীক ইউটোপিয়ান জগত বানিয়ে জীবন কাটায়নি। হাসি-আনন্দ-দুঃখ-বেদনায় সফল একটা জীবন কাটিয়েছে। কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক জীবন বা বন্ধুমহল- জীবনের প্রতি স্তরে ও সফলতার শীর্ষেই ছিল। কিন্তু এই শীর্ষস্থান ওকে জীবন থেকে আলাদা করে অন্য মাত্রা দেয়নি। ও যেন সচেতন হয়ে সেই নকল পোষাক এড়িয়ে গেছে। সবার মধ্যে- সবার সাথে- সবার জন্য একটা জীবন কাটাবে বলে মনে মনে পণ করেছিল বুঝি। 

রাশীদ, আমরা তো জীবন যাপন করি নিজেদের মত করে। তুই জীবন যাপন করেছিস আর উদযাপনও করেছিস প্রাণভরে। তোর প্রাণশক্তি, সততা, মানবিকতা আর সবাইকে নিয়ে একসাথে থাকার এই মানসিকতার পরাগায়ন হোক মম চিত্তে। তোর হাসিতে, তোর ভালোবাসায় আর আমাদের একটু একটু বেড়ে ওঠার এই কাল থেকে কালান্তরে। 

আমাদের অপাপবিদ্ধ চোখে সবুজ আগামীর স্বপ্ন থেকে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তুই নক্ষত্র ছিলি, থেকে যাবি অমলিন।

বন্ধুরে তোর কাছেই আমাদের ভালোবাসা,  ঋণ।

ফুটনোটঃ লেখায় নানা তথ্য আর স্মৃতিচারণ করে আমাকে সহযোগিতা করেছে আমাদের তিন বন্ধু। কামরুল আহমেদ ( কলেজ নাম্বার-৩৬৭৫), হাসান আশরাফ মিঠু (কলেজ নাম্বার-৩১৭২) আর সালেহ আহমেদ (কলেজ নাম্বার-৩২২৮)

তোদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ

শ্রদ্ধাঞ্জলি- বাসুদা

সময়ের সাথে দেখা হলে একটি কথাই জিজ্ঞেস করতাম। ‘এত অগোচরে, এত দ্রুত কীভাবে চলে যাও!’

বাসুদার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বিপরীত প্রান্তে বাসুদার বাসায় আড্ডা-গান নিয়ে সময় কাটিয়েছি এন্তার। সহজ মানুষ ছিলেন। বয়সে আমার সিনিয়র ছিলেন তো বটেই কিন্তু আমার সাথে বন্ধুর মত মিশতেন। আমিও সহজ হয়ে গিয়েছিলাম বাসুদার সাথে। ভালো লাগা- না লাগা অকপটে বলে ফেলতাম। এই নিয়ে একটা দিনও মনক্ষুণ্ণ হতে দেখিনি।

তখন বাপ্পা-বাসু জুটি বেঁধে কাজ করে। বাসুদার বাসায় গেলেই দেখা যেত এক ঝাঁক ছেলে-মেয়ে বসে গান শিখছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই সমস্বরে গান শোনা যেত তাই। সেই সময়ে স্টুডিও পাড়ায় গেলে ক্যাসেট বের করতে চান এ রকম অনেক নতুন মুখের সাথে দেখা হতো। সারি বেঁধে বসে থাকতেন। অডিও আর্ট স্টুডিওতে এ রকম এক রাতে গিয়েছি। হঠাৎ পরিচিত একজন আমাকে চিনে ফেলে ‘আরে রানা, তুমি এখানে কী করো?’- প্রশ্নে বাসুদার গম্ভীর মুখের উত্তর- ‘ও রানা, আমাদের বন্ধু …আমার কানে এখনও ধাক্কা দেয়। কানে নয়, আসলে হৃদয়ে।

বাসুদার চমৎকার কিছু সুর আছে। ‘তোমার ঐ মনটাকে একটা ধূলো মাখা পথ করে দাও, আমি পথিক হব’ অথবা ‘হৃদয়হীনা তুমি কী আমার কথা ভাবো’। ‘পাখি উড়ে যায় কবিতার ডানা মেলে’ গানটার কথাও মনে পড়ে। তিনটা গানই ‘একটি নারী অবুঝ’ মিক্সড অ্যালবামের। নানা ধুনের, ফোক- মেলো রক-ফিউশনের একটা ভালো অ্যালবাম ছিল। বাসুদার স্টুডিওতেই পাখি লিরিকের সুত্রে মিজানের সাথে পরিচয় হয়েছিল। গীতিকারকে মনে রাখার কথা বলেছিলেন, ঠিক কী বলেছিলেন আমার আর মনে নেই। শুধু মনে আছে মিজানের সম্মতি এবং সহাস্যে দুজনের করমর্দন। বিলক্ষণ মনে পড়ে, গীতিকার সকালকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের মিরপুরের বাসায়। সেই অ্যালবামে সকল গীতিকারের ছবি গিয়েছিল। এর আগে গানের কোনো অ্যালবামে আমি অন্তত গীতিকারের ছবি দেখিনি।

পরে আর একটা কাজ করেছিলাম। বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি মিক্সড অ্যালবামের। ‘দুঃখ শেষ হয়, শেষ হয় কষ্টের রাত্রি’। বালাম গেয়েছিলেন। এর পর আর বাসুদার সাথে আমার কাজ করার সুযোগ হয়নি। যোগাযোগও ক্ষীণতর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাসুদার সাথে আমার বন্ধুতা একইরকম ছিল। ঢাকায় গিয়ে বাসুদার সাথে যোগাযোগ হয়েছে, এডিনবরা থাকতে একরাতে দূরালাপনীতে দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতা হয়েছে। দেশের গানের বিশাল কর্মযজ্ঞের কথা শুনে আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, করছে কী বাসুদা! এই কাজ শেষ হবে তো? শেষ পর্যন্ত বাসুদার আকস্মিক প্রয়ানে এক হাজার গানের কাজ আর শেষ হলো না।

রাজারবাগের সেই বাসায় দেখা হত অনেকের সাথেই। মোনায়েম, সেই শুরুর দিকের সন্দীপনদা, স্বপ্নীলদা, সকাল আর বাপ্পা ভাই। মাঝে মাঝে একসাথেই আমি আর বাপ্পা ভাই বাসুদার বাসায় যেতাম। গান নিয়ে আড্ডা আর বাসুদার উচ্চ মার্গের রসিকতায় হাসির হুল্লোর উঠতো সেই ঘরে। সমস্বরে।

শোণিত প্রাণের ধারায় ভালো থাকুন বাসুদা। মানুষের নিখাদ ভালোবাসাই আমি মনে রাখব। আপনাকে তাই মনে রেখেছি, আজীবন আপনি আমার অন্তরে থাকবেন।কবিতার ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখি অথবা দুঃস্বপ্ন শেষে আলোর পথযাত্রী হয়ে।

শ্রদ্ধাঞ্জলী, বাসুদা’

টুকরো নাগরিক জার্নাল

ক্যানটন, কার্ডিফউনত্রিশ/ ডিসেম্বর। ২০২০